মোঃ আইনুল ইসলাম
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৩৩ জন

মেধা নয়, মনুষ্যত্বই মানুষের প্রকৃত পরিচয়

মেধা পথ দেখায়, কিন্তু সততা ও বিবেক ঠিক করে—সেই পথ কোথায় যাবে। মেধা মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। জ্ঞান ও দক্ষতা একজন মানুষকে সাফল্যের উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু মেধার সঙ্গে যদি নৈতিকতা, সততা, বিবেক ও মানবিকতা না থাকে, তাহলে সেই মেধা মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে অন্যায়ের হাতিয়ারও হয়ে উঠতে পারে। সেখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—একজন মানুষ কতটা মেধাবী, তার চেয়ে সে কতটা নীতিবান ও মানবিক—সেটিই কি তার প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড হওয়া উচিত নয়? মেধা যোগ্যতা প্রমাণ করে, চরিত্র মানুষকে মূল্যবান করে। সমাজে মেধাবী মানুষের প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, প্রশাসন, সাংবাদিকতা, ব্যবসা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দক্ষ ও মেধাবী মানুষের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু মেধা নিজে কোনো নৈতিক গুণ নয়। একজন ব্যক্তি তার মেধা দিয়ে যেমন নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন, তেমনি অসৎ উদ্দেশ্যে সেই মেধা ব্যবহার করে প্রতারণা, দুর্নীতি বা অন্যায়ের পথও সহজ করতে পারেন। তাই মেধার মূল্য তখনই সর্বোচ্চ হয়, যখন তা সততা, ন্যায়বোধ ও জনকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত হয়। শিক্ষা কতটা, তার পাশাপাশি মানুষটি কেমন—প্রশ্নটি জরুরী। একজন মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা যতই বেশি হোক, তার আচরণে যদি অন্যের প্রতি সম্মান না থাকে, সত্যের প্রতি আনুগত্য না থাকে এবং নিজের স্বার্থের বাইরে সমাজের কথা ভাবার মানসিকতা না থাকে, তাহলে তার শিক্ষার মানবিক দিকটি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

কারণ প্রকৃত শিক্ষা শুধু তথ্য ও জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; শিক্ষা মানুষের চিন্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নৈতিকতার বিকাশ ঘটায়।
ডিগ্রি যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারে; চরিত্র মানুষের পরিচয় বহন করে।

ইসলামী শিক্ষায় অহংকারের পরিণতির যে শিক্ষা ইসলামী ঐতিহ্যে ইবলিসের ঘটনা অহংকার ও অবাধ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহর আদেশের সামনে অহংকার প্রদর্শন করাই তার পতনের কারণ হয়েছিল।

আরও পড়ুন:

এখান থেকে একটি সাধারণ নৈতিক শিক্ষা পাওয়া যায়—জ্ঞান বা যোগ্যতা মানুষকে বিনয়ী না করলে সেই যোগ্যতার ইতিবাচক মূল্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ জ্ঞান যত বাড়বে, আত্মসমালোচনা ও দায়ীত্ববোধও তত বাড়া উচিত।

চরিত্রের আসল পরীক্ষা হয় সুযোগের সময়, মানুষের প্রকৃত চরিত্র অনেক সময় প্রকাশ পায় তখনই, যখন তার সামনে অন্যায়ভাবে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আসে। কেউ দেখছে না—তখনও কি সে সৎ থাকে? ক্ষমতা হাতে এলে—তখনও কি সে অন্যের অধিকারকে সম্মান করে? নিজের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও—সে কি সত্যের পক্ষে থাকতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই একজন মানুষের নৈতিক অবস্থান সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়।

সততা তখনই অর্থবহ, যখন অসততার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মানুষ সৎ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যক্তিত্ব মানে শুধু পরিচিতি নয় সামাজিক পরিচিতি, অর্থ, পদ-পদবি কিংবা জনপ্রিয়তা একজন মানুষকে দৃশ্যমান করতে পারে; কিন্তু এগুলো একাই ব্যক্তিত্বের প্রমাণ নয়। প্রকৃত ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায় মানুষের আচরণে—বিশেষ করে তার চেয়ে দুর্বল বা অসহায় মানুষের সঙ্গে আচরণে।

যে ব্যক্তি নিজের অবস্থান ব্যবহার করে অন্যকে ছোট করেন, তার বাহ্যিক সাফল্য যত বড়ই হোক, সেটি মানবিক উৎকর্ষের প্রমাণ নয়।
অন্যদিকে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও যে মানুষ অন্যের অধিকারকে সম্মান করেন, কথা ও কাজে সামঞ্জস্য রাখেন এবং অন্যায় সুবিধা প্রত্যাখ্যান করেন—তার চরিত্রই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও মেধার সঙ্গে নৈতিকতা অপরিহার্য সাংবাদিকতার কাজ শুধু তথ্য প্রকাশ করা নয়; তথ্য যাচাই করা, জনস্বার্থ বিবেচনা করা এবং সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারকে সম্মান করাও পেশাগত দায়ীত্বের অংশ। একজন সাংবাদিকের অনুসন্ধানী মেধা যেমন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সামনে আনতে পারে, তেমনি যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রকাশ করলে নিরপরাধ ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই দায়ীত্বশীল সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো—তথ্য, প্রমাণ, যাচাই, ভারসাম্য ও জনস্বার্থ। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়, বরং তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য তুলে ধরাই সাংবাদিকতার মর্যাদা। নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের প্রত্যাশা কী? সন্তানের মেধা বিকাশের পাশাপাশি তার নৈতিক ও মানবিক বিকাশ নিশ্চিত করাও পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়ীত্ব। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়— সত্য বলা, অন্যের অধিকার সম্মান করা, ভুল স্বীকার করা, অন্যায় সুবিধা প্রত্যাখ্যান করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের সাফল্যের সঙ্গে বিনয় ধরে রাখার শিক্ষাও জরুরী। কারণ আগামী দিনের সমাজ শুধু মেধাবী মানুষের ওপর নয়, দায়ীত্বশীল ও নীতিবান মানুষের ওপরও নির্ভর করবে।

শেষ কথা: মেধা একজন মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেয়। কিন্তু সেই সক্ষমতার ব্যবহার নির্ধারণ করে তার বিবেক, চরিত্র ও মূল্যবোধ। তাই কাউকে মূল্যায়নের সময় শুধু তার মেধা, ডিগ্রি, পদ বা সাফল্য দেখলেই হবে না; দেখতে হবে তার সততা, মানবিকতা, নৈতিকতা ও মানুষের প্রতি আচরণ।

কারণ শেষ বিচারে— “মেধা মানুষকে যোগ্য করে, আর চরিত্র তাকে সম্মানিত করে।” সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন মেধাবী মানুষের পাশাপাশি আমরা সৎ, মানবিক, বিবেকবান ও দায়ীত্বশীল মানুষ তৈরিকে সমান গুরুত্ব দেব। মেধার অহংকার নয়—মেধার সঠিক ব্যবহারই হোক আমাদের পরিচয়।

 

 

প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন:
মোঃ আইনুল ইসলাম
বার্তা সম্পাদক
দুর্নীতি তালাশ নিউজ টিভি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মেধা নয়, মনুষ্যত্বই মানুষের প্রকৃত পরিচয়

শাহজাদপুরবাসীর আস্থা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিসেস সাবরিনা

উল্লাপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খাবার সরবরাহে অনিয়ম পরিদর্শনে এমপি

খুলনায় বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

সকলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি

দাগহীন আলু কীভাবে চিনবেন, সংরক্ষণের উপায়

ঘুম ভাঙতেই শুকিয়ে যাচ্ছে মুখ

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে হতে পারে যেসব মারাত্মক রোগ

ইফতারের পর শরীরের ক্লান্তিভাব দূর করবেন যেভাবে