বিদ্যুৎ খাতে সরকারের আর্থিক চাপ কমাতে গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার নতুন চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে, বিদ্যমান যেসব বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির দাম গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি, সেগুলোর মেয়াদও বাড়ানো হবে না। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি সরকারের ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ৬ অক্টোবর অর্থ বিভাগকে পাঠানো এক চিঠিতে বিদ্যুৎ বিভাগ সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়। চিঠিতে বলা হয়, বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় ও গ্রাহকদের কাছে বিক্রির দামের ব্যবধানের কারণে সরকারের ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা কমাতে এ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সংস্কার পরিকল্পনার সুপারিশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেও এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতি ইউনিটে ৪ টাকা ৩০ পয়সা ঘাটতি
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে ১২ টাকা ৮০ পয়সায় কিনে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে ৮ টাকা ৫০ পয়সায়। ফলে প্রতি ইউনিটে ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ৪ টাকা ৩০ পয়সা। এ ঘাটতি পূরণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
বিপিডিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সার্বিক গড় দাম ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫৬ পয়সা।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে খরচ হচ্ছে ১৩ টাকা ৫৭ পয়সা। অন্যদিকে, ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে ১৪ টাকা ৮৬ পয়সায়। এ ছাড়া আরও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে কমতে পারে ভর্তুকি
বিদ্যুৎ বিভাগের আশা, নতুন নীতি কার্যকর হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির প্রয়োজন কমতে শুরু করবে। পরবর্তী বছরগুলোতে এ চাপ আরও কমতে পারে। তবে এ উদ্যোগের মাধ্যমে ঠিক কত টাকা সাশ্রয় হবে, তা সংশ্লিষ্ট চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানিয়েছেন, সরকারি মালিকানাধীন কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দাম ইতিমধ্যে গড় দরের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। অন্য কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রমে একই পদ্ধতি অনুসরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি কমানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং গ্রাহকদের জন্য দাম সাশ্রয়ী রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস ইনস্টিটিউটের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম টিবিএসকে বলেন, গড় লেভেলাইজড ট্যারিফের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ কেনার নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকি কমতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপও কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধরন, জ্বালানির সরবরাহ এবং উৎপাদনক্ষমতার ব্যবহারের ওপর বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় নির্ভর করে। একই ধরনের কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও ব্যয়ের পার্থক্য থাকতে পারে। তাই গড় ট্যারিফ নির্ধারণে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য কারিগরি পদ্ধতি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সারের ভর্তুকি নিয়েও নতুন পরিকল্পনা
বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি কৃষি খাতের ভর্তুকি ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী, সারের ওপর সরাসরি মূল্যনিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক দাম নির্ধারণ এবং প্রকৃত উপকারভোগী কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্নয়নবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারের ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক সুবিধা পাচ্ছেন বড় কৃষকেরা। অন্যদিকে, দেশের মোট কৃষকের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক হলেও তাঁরা পাচ্ছেন ভর্তুকির মাত্র ১৩ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সারের ভর্তুকি প্রায় চার গুণ বেড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে ভর্তুকির সুবিধা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে তা আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সারের দাম কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখার পরিবর্তে বাজারভিত্তিক দামে বিক্রি এবং যোগ্য কৃষকদের কৃষক কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য কৃষকদের তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ চলছে। এতে জমির পরিমাণ, চাষাবাদের ধরন ও উৎপাদিত ফসলসহ কৃষকদের বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। এর মাধ্যমে কোন কৃষক কতটুকু সহায়তা পাওয়ার যোগ্য, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইএমএফের সঙ্গে সংস্কার আলোচনা
বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে ভর্তুকির ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার বিষয়টি আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার আলোচনারও অংশ। নতুন ঋণসহায়তা কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। অর্থ বিভাগের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে কর্মসূচিটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ নিয়ে ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে আলোচনা চলছে।
সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি ব্যয় কমাতে চায় সরকার। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ওপর।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন