গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি : ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তানের জন্ম, ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ—বাংলার ইতিহাসের নানা বাঁকের জীবন্ত সাক্ষী নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার যোগেন্দ্রনগর গ্রামের আব্বাস প্রামাণিক। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তার বয়স এখন ১২৩ বছর।
দীর্ঘ জীবনের ভারে ন্যুব্জ শরীরে লাঠি ছাড়া চলাফেরা করা কঠিন। বয়সের সঙ্গে কমেছে শ্রবণশক্তিও। তবে এখনো অটুট তার দৃষ্টিশক্তি। চশমা ছাড়াই প্রতিদিন পবিত্র কুরআন শরিফ তেলাওয়াত করেন তিনি।
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, আব্বাস প্রামাণিকের জন্ম ১৯০৩ সালে। সে হিসাবে তিনি দেশের প্রবীণতম ব্যক্তিদের একজন। কর্মজীবনে তিনি খুবজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। মাত্র ৬০ টাকা বেতনে চাকরি করার পাশাপাশি এলাকার শিশুদের বিনামূল্যে কোরআন শিক্ষা দিতেন।
সরেজমিনে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙাচোরা একটি ঘরে নাতি-নাতবউদের সঙ্গে বসবাস করছেন আব্বাস প্রামাণিক। স্ত্রী মারা গেছেন বহু বছর আগে। বয়সের ভারে শরীর অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়লেও এখনো নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। প্রতিদিন চশমা ছাড়াই কুরআন তেলাওয়াত করেন তিনি।
ছয় ছেলে ও দুই মেয়ের জনক আব্বাস প্রামাণিকের প্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে গরুর দুধ, মসুর ডাল ও বাতাসা।
দীর্ঘ জীবনে তিনি দেখেছেন সমাজ ও দেশের বহু পরিবর্তন। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান পর্ব, ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ—ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নানা সময় পেরিয়ে আজ তিনি পরিবারের প্রবীণতম সদস্য। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও ধর্মীয় অনুশীলন ও সরল জীবনযাপনের অভ্যাস এখনো ধরে রেখেছেন তিনি। এলাকার মানুষের কাছেও তাই তিনি শুধু একজন শতায়ু প্রবীণ নন, অতীতের বহু সময়ের এক জীবন্ত সাক্ষী।
আব্বাস প্রামাণিকের মেয়ে আলিমা বেগম বলেন, “আমার আব্বা এখনো চশমা ছাড়া কোরআন পড়েন। অথচ আমরা তার সন্তানেরাই এখন চোখে ঝাপসা দেখি। ছোটবেলা থেকেই আব্বাকে সৎ ও সহজ-সরল জীবনযাপন করতে দেখেছি।”
নাতি শফিকুল ইসলাম বলেন, “দাদা সারাজীবন সৎ ও ধার্মিক জীবনযাপন করেছেন। তিনি গাড়িতে চড়াকে বিলাসিতা মনে করতেন। তাই জীবনের বেশিরভাগ সময় হেঁটেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতেন। এখনো সুযোগ পেলেই লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ির উঠানে কিছুক্ষণ হাঁটেন।”
পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও সবাই মিলে আব্বাস প্রামাণিকের দেখাশোনা করেন। নাতি বেলাল হোসেন বলেন, “আমরা সবাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী দাদার যত্ন নিই। কিন্তু এই বয়সে তার সার্বক্ষণিক যত্ন, পুষ্টিকর খাবার ও ভালো একটি বাসস্থানের প্রয়োজন।”
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, “আব্বাস প্রামাণিক আমাদের উপজেলার একজন প্রবীণতম ব্যক্তি। তার চলাচলের সুবিধার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ির সামনে সিঁড়ি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। খুবজীপুর প্রবীণ সেবাকেন্দ্র তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে। উপজেলা প্রশাসনও বিভিন্ন সময়ে তাকে সহযোগিতা করে আসছে। আমরা তার প্রতি আরও দৃষ্টি রাখব।”
১২৩ বছরের এই প্রবীণের জীবন তাই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; তার জীবনের সঙ্গে মিশে আছে বাংলাদেশের দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু অধ্যায়।
মন্তব্য করুন