ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দিনাজপুরে যথাযোগ্য মর্যাদায় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বর্ণাঢ্য র্যালী ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৭ নভেম্বর) দিনব্যাপী এসব কর্মসূচীতে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। দিবসটি উপলক্ষে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, এমপির। বিশেষ কারণে তিনি স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেননি। একই কারণে জাতীয় সংসদের হুইপ মোঃ আখতারুজ্জামান মিয়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি তাঁর বক্তব্যে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত ১৫ বছর এ দিবসটি পালন করা সম্ভব হয়নি এবং তৎকালীন সরকারের সময় তাঁদের দিবসটি পালন করতে দেওয়া হয়নি। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মোঃ জেদান আল মুসা, পিপিএম তাঁর বক্তব্যে ইতিহাস জানার পাশাপাশি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, শুধু ইতিহাস জানলেই হবে না, সেই ইতিহাসের আলোকে কাজ করতে হবে। নিজেদের উন্নত করতে হবে এবং মন-মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন দিনাজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মোঃ মোফাজ্জল হোসেন দুলাল, দিনাজপুর সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ লুৎফর রহমান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার মোঃ মোকশেদ আলী মঙ্গলিয়া। তাঁরা দিবসটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য, জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম, সামাজিক দায়ীত্ববোধ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক সমাজ গঠনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ রফিকুল ইসলাম।সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, জাতীয় দিবসগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপনের বিষয় নয়; বরং এসব দিবসের তাৎপর্য অনুধাবন করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়া এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার গ্রহণ করা জরুরী।
তিনি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ—‘বিপ্লব’ ও ‘সংহতি’র তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, বিপ্লব হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত আমূল পরিবর্তনের প্রত্যাশা, আর সংহতি হচ্ছে সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নে মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও সম্মিলিত অবস্থান। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়ীত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, পৃথিবীকে উন্নত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার শিক্ষা। একজন শিক্ষক যদি একজন ভালো মানুষ তৈরি করতে পারেন, তাহলে সেই শিক্ষার্থীর মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে একজন ভালো কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বাবা কিংবা মা গড়ে উঠতে পারেন। তাই উন্নত রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণে নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা ধারণ করতে হলে দেশের আইন-কানুন জানতে হবে এবং পরিবার ও সমাজের অন্যদেরও সে বিষয়ে সচেতন করতে হবে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য উপলব্ধি করে সবাইকে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস. এম. হাবিবুল হাসানসহ জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সরকারী দপ্তরের প্রতিনিধিবৃন্দ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
বিকেলে জেলা বিএনপির র্যালী ও সমাবেশ
অন্যদিকে, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিকেল ৪টায় দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জেলা বিএনপির উদ্যোগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচি।
সমাবেশে বক্তারা ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের চেতনায় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
সমাবেশ শেষে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালী বের করা হয়। র্যালীটি দিনাজপুর শহরের কাচারী রোড, পৌরসভা রোড ও সদর হাসপাতাল রোডসহ প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেল রোডে অবস্থিত জেলা বিএনপির কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। র্যালীতে জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মোঃ মোকাররম হোসেন, সহসভাপতি আলহাজ্ব মাহবুব আহমেদ, মোঃ আখতারুজ্জামান জুয়েল ও মোঃ হাসানুজ্জামান উজ্জ্বল, মোঃ খালেকুজ্জামান বাবু, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম মুন্না, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন ও মোঃ নাজমুল হুদা জনি, কোষাধ্যক্ষ আনিসুর রহমান বাদশা এবং পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মণ্ডল বকুলসহ জেলা ও পৌর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া দিনাজপুর জেলা যুবদলের আহ্বায়ক এ কে এম মাসুদুল ইসলাম মাসুদ, সদস্যসচিব রেজাউর রহমান রেজা, জেলা মহিলা দলের সভাপতি জিনাত আরা ও সাধারণ সম্পাদক শাহীন সুলতানা ডিউটি, কেন্দ্রীয় তাঁতীদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও দিনাজপুর জেলা তাঁতীদলের সভাপতি মোঃ রেজাউল ইসলাম গুরু এবং জেলা তাঁতীদলের সাধারণ সম্পাদক মোঃ হাসু খাঁন, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ সেলিমসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা র্যালীতে অংশগ্রহণ করেন।
দিনব্যাপী কর্মসূচীতে জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারী দপ্তর, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য, জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম, শিক্ষা ও ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন