গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ ও আর্কটিক এই ভূখণ্ডে রাশিয়া-চীনের ঘাঁটি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে ডেনমার্ক। বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ডেনমার্ক ও স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড উভয়ই চুক্তিটিকে স্বাগত জানায়। আগামী সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তারা চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, “আশা করা যায়, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে এমন একটি বাধ্যতামূলক চুক্তি হবে, যা আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করবে।”
চুক্তিটিতে ডেনমার্কের মৌলিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এটি গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। যদিও চুক্তির শর্তগুলো এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে ডেনমার্ক বলছে, তাদের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রয়েছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, “ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিটি ডেনমার্ক রাজ্য ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। এটি ন্যাটো ও ইউরোপের জন্য ভালো।”
এদিকে, গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেন, “চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডের স্বার্থকে স্বীকৃতি দেবে এবং নিরাপত্তাকে জোরদার করবে।”
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁও শনিবার এ বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, চুক্তিটি আর্কটিক ভূখণ্ডটির ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করতে সহায়তা করবে।
অবশ্য গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের বাসিন্দাদের মধ্যে অবশ্য এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
২৯ বছর বয়সী হেয়ার স্টাইলিস্ট সোরেন ক্রয়ৎজমান এএফপিকে বলেন, “চুক্তিটি কী বা কী স্বাক্ষর হয়েছে, তা আমি ঠিক জানি না। তবে যখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্পের কথা আসে, আমার মিশ্র অনুভূতি হয়। গ্রিনল্যান্ড এখন যে পরিমাণ মনোযোগ পাচ্ছে, তাতে আমি পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই।”
৬৪ বছর বয়সী শিক্ষিকা বিবি ক্লেইস্ট ইয়েপসেন বলেন, “আমরা আশা করি, নেতারা একটি ভালো চুক্তি করেছেন। কারণ আমাদের দেশকে আকাশ ও সমুদ্র দুই দিক থেকেই সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন। ডেনমার্ক বহু বছর ধরে বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।”
ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে গ্রিনল্যান্ডে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলতে শুরু করবে। তিনি বলেন, “এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিপক্ষ গ্রিনল্যান্ডে ঘাঁটি স্থাপন করতে, সামরিক উপস্থিতি রাখতে বা সংবেদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না।”
ট্রাম্প চুক্তিটিকে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও ডেনমার্কের বিশ্লেষকেরা বলেছেন, তিনি সম্ভবত খুব বেশি কিছু অর্জন করতে পারেননি।
তারা উল্লেখ করেন, ১৯৫১ সালের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি, যা ২০০৪ সালে হালনাগাদ করা হয়, তার আওতায় ওয়াশিংটন আগেই ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে আগে জানিয়ে দ্বীপটিতে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারত।
উষ্ণ হয়ে ওঠা আর্কটিকে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে রাশিয়া ও চীন গ্রিনল্যান্ডে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চাইছে বলে ট্রাম্প বারবার সতর্ক করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা গাদ বলেন, “এই চুক্তি নিশ্চিত করে যে চীন ও রাশিয়া গ্রিনল্যান্ডে কোনো ঘাঁটি স্থাপন করতে পারবে না, সেখানে সেনা পাঠাতে পারবে না। সংবেদনশীল খাতে বিনিয়োগ ঠেকানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও এতে রাখা হয়েছে।”
তবে চুক্তির বিস্তারিত এখনও জানা যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রিনল্যান্ডে ঘাঁটি নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রকে একচেটিয়া সুযোগ দেওয়া হলে, ইউরোপের ন্যাটো মিত্রদের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে।”
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিরোধ যখন চরমে পৌঁছেছিল, তখন ৫৭ হাজার মানুষের এই ভূখণ্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি ট্রাম্প। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে ন্যাটো আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারে একটি অভিযান শুরু করেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প কৌশলগত কারণে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা প্রয়োজন বলে বারবার দাবি করে আসছেন। এতে ন্যাটোর মিত্র ডেনমার্ক উদ্বিগ্ন হয় ও জোটের পক্ষ থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
মন্তব্য করুন