সবুজ পাতায় ঘেরা সতেজ করলা ক্ষেত। থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা ফলন দেখে ঋণের বোঝাও থমকে গিয়েছিল চাষী ইসলাম উদ্দিনের মুখে ফুটে ওঠা হাসির কাছে। কিন্তু সেই হাসির মেয়াদ যে এতোটা স্বল্প হবে, তা স্বপ্নেও ভাবেননি পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার এই প্রান্তিক কৃষক। একটি মাত্র ভুলের মাশুল—নাকি ভেজাল বালাইনাশকের বিষাক্ত ছোবল? এক রাতেই ঝলসে গিয়ে ছাই হয়ে গেছে তার প্রায় তিন বিঘা জমির স্বপ্ন।
উপজেলার মির্জাপুর তেলিপাড়া এলাকার কৃষক ইসলাম উদ্দিনের অভিযোগ, ধার-দেনা করে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচে এ বছর করলার আবাদ করেছিলেন। গত ১৮ অক্টোবর আটোয়ারী উপজেলা সদরের ফকিরগঞ্জ বাজারের বালাইনাশক ব্যবসায়ী আনিছুর রহমান লেবুর দোকান থেকে ‘পেট্রোকেম বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর ১০০০ মিলির ‘এম পেড’ নামক একটি জৈব বালাইনাশক কিনেন তিনি। নিয়ম অনুযায়ী স্প্রে করার পরদিনই যেন বদলে যায় চিত্র। সবুজ বাগান বিবর্ণ হতে শুরু করে, ডগা মরে যায় এবং একপর্যায়ে তিন বিঘা জমির পুরো করলা বাগান ঝলসে নষ্ট হয়ে যায়।
”সবে দুই দফা ফলন বিক্রি করতে পেরেছিলাম। ‘এম পেড’ স্প্রে করার পরেই আমার পুরো করলা বাগান শেষ! গাছ মরে গেছে, ফল ঝরে পড়ছে। ধার-দেনা করে আবাদ করেছিলাম, এখন এই লোকসান কীভাবে সামলাবো?”—চোখের পানি মুছতে মুছতে আকুতি ঝরে পড়ে কৃষক ইসলাম উদ্দিনের কণ্ঠে। তিনি এই ভেজাল বালাইনাশক বিক্রির পেছনে জড়িতদের বিচার ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
স্থানীয় অন্যান্য কৃষকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষোভ ও আতঙ্ক। পাশের কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, “পুরো এলাকায় ইসলাম উদ্দিনের বাগানেই সবচেয়ে ভালো ফলন হয়েছিল। ওষুধ দেওয়ার পর পুরো বাগান শেষ। সরকার যদি এখনই এসব প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নেয়, তবে আমরা কৃষকরা কোথায় যাবো?”
আরেক কৃষক আব্দুল কুদ্দুস অভিযোগ তুলে বলেন, “ইদানীং নামে-বেনামে বহু কীটনাশক কোম্পানির প্রতিনিধি এসে গ্রামের সহজ-সরল কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে নিম্নমানের পণ্য ধরায়া দেয়। কিন্তু ক্ষতি হয়ে গেলে আর তাদের দেখা মেলে না।” ইসলাম উদ্দিনও জানান, ওষুধ কেনার আগে কোম্পানির প্রতিনিধিরা বারবার এলেও এখন তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে অভিযোগের বিষবাষ্প গায়ে মাখতে নারাজ বিক্রেতা ও কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। কীটনাশক বিক্রেতা আনিছুর রহমান লেবু দাবি করেন, “এই ওষুধ অন্য অনেক কৃষকও ব্যবহার করেছেন, কারও তো ক্ষতি হয়নি। নিশ্চয়ই ওই কৃষক স্প্রে করার নিয়মে ভুল করেছেন।”
একই সুর ‘পেট্রোকেম বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর স্থানীয় অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্কেটিং অফিসার সবুজ আলীর কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “এমনটা কেন হলো তা বুঝতে পারছি না। হয়তো তিনি এই ওষুধের সাথে অন্য কোনো রাসায়নিক মিশিয়ে স্প্রে করেছিলেন।”
অভিযোগের তীর যখন ডিলার ও কোম্পানির দিকে, তখন বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কৃষি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে যোগাযোগের জন্য আটোয়ারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এনজিও এবং মহাজনের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে এখন নিঃস্ব ইসলাম উদ্দিন ঘুরছেন বিচারের আসায়। এক বালাইনাশকের বিষাক্ত থাবায় তার তিন বিঘা ক্ষেতের ফলন তো গেছেই, সাথে মরে গেছে বেঁচে থাকার অবলম্বনও।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন