সৈয়দ জালিস মাহমুদ ,বাগেরহাট প্রতিনিধি :
২৯ অক্টোবর ২০২৬, ৫:৩৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৩৬ জন

মহাজনের চড়া সুদে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন জেলেরা

শুরু হয়েছে সুন্দরবনের দুবলার চরে শুঁটকি তৈরির মৌসুম। আবারও কর্মব্যস্ত হয়ে উঠবে শুঁটকি পল্লি। জীবনের ঝুঁকি ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মাছ আহরণে সাগরে পাড়ি জমাচ্ছেন উপকূলের হাজারো জেলে। মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরি করে ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা। তবে চড়া সুদের ঋণ, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং দস্যু আতঙ্ক তাঁদের সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে জেলেরা নিজেদের মতো করে জাল, দড়ি, নৌকা ও ট্রলার প্রস্তুত করেছেন। কেউ নতুন ট্রলার তৈরি করেছেন, আবার কেউ পুরোনো নৌকা মেরামত করেছেন। প্রস্তুতি অনুযায়ী অনেকেই আগেভাগে রওনা দেওয়ার জন্য রামপালের নদীতীরে এসে অবস্থান নিয়েছেন।

 

বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাত ১২টার পরপরই দুবলার চরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে জেলেদের। সেখানে আগামী পাঁচ মাস অবস্থান করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির কাজ করবেন তাঁরা।

 

জেলেরা জানান, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে নৌকা-ট্রলার প্রস্তুত, জাল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এ অর্থের জোগান দিতে অনেকেই চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছেন। কেউবা ব্যাংক, এনজিও ও বিভিন্ন সমিতি থেকে ঋণ করছেন। আবার অনেকে টাকা না পেয়ে স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে অর্থ সংগ্রহ করছেন। ঋণ ও সুদের বোঝা মাথায় নিয়েই তাঁদের শুরু করতে হচ্ছে পাঁচ মাসের অনিশ্চিত জীবন।

 

বহরদার কামরান বলেন, “প্রতি বছর আমরা বিভিন্নভাবে ঋণ করে সমুদ্রে যাই। এ বছরও পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করেই সাগরে যাচ্ছি। সরকারিভাবে আমরা তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাই না।”

 

তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনে জলদস্যু-বনদস্যুর উৎপাত, মুক্তিপণ আদায় ও অসাধু বনরক্ষীদের দৌরাত্ম্য দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। তবে এবার এসব তৎপরতা আবার বেড়েছে কি না, তা তিনি জানেন না। শুনেছেন, জলদস্যু-বনদস্যুর উৎপাত আবারও বেড়েছে।

 

জেলে অলোক হালদার বলেন, বন বিভাগের পাস নিয়েই তাঁরা দুবলার চরের উদ্দেশে রওনা হন। ধারদেনা করেই তাঁদের সাগরে যেতে হয়। এবার অনেকে সুদে টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে টাকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

 

জেলেরা জানান, দীর্ঘদিন সাগরে দস্যুদের উৎপাত না থাকলেও এবার আবার দস্যুদের দেখা যাচ্ছে বলে তাঁরা শুনেছেন। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতির ঝুঁকি নিয়েই হাজার হাজার জেলেকে সাগরে যেতে হচ্ছে।

 

দুবলার চর বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের দক্ষিণে, কটকার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং হিরণ পয়েন্টের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি বিচ্ছিন্ন চর। কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝে অবস্থিত এ চরের আয়তন প্রায় ৮১ বর্গমাইল। আলোরকোল, হলদিখালি, কবরখালি, মাঝেরকিল্লা, অফিসকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া, ছোট আমবাড়িয়া ও মেহের আলীর চর নিয়ে দুবলার চর গঠিত। রাসমেলা, পুণ্যস্নান ও হরিণের জন্যও চরটি পরিচিত।

 

বর্ষা মৌসুমে ইলিশ আহরণের পর বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার জেলেরা পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ মাসের জন্য সেখানে অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। মেহের আলীর খাল, আলোরকোল, মাঝেরচর, অফিসকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া, মানিকখালী, ছাফরাখালী ও শ্যালারচরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে জেলে পল্লি। এসব এলাকায় মাছ আহরণের পাশাপাশি শুঁটকি শুকানো ও পাইকারি বাজারে বিক্রির কাজ চলে।

 

সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের বন বিভাগের কাছ থেকে মাছ আহরণের অনুমতি নিয়ে বহরদার ও জেলেরা দুবলার চরে প্রবেশ করেন। বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি), জ্বালানি কাঠ ব্যবহারের অনুমতিসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বন বিভাগকে রাজস্ব দিতে হয়। এ ছাড়া আহরিত শুঁটকি মাছের পরিমাণ ও প্রজাতিভেদে নির্ধারিত রাজস্ব প্রদান করতে হয়।

 

জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির রামপাল শাখার সভাপতি বলেন, পাস-পারমিট হাতে পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর জেলেরা দুবলার চরের উদ্দেশে রওনা হবেন। তাঁরা প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়েই যাবেন।

 

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিম বলেন, বন বিভাগের কাছ থেকে পাস নিয়ে জেলেদের নিজ নিজ এলাকা থেকে সরাসরি দুবলার চরে যেতে হবে। চরে ঘরবাড়ি কিংবা দোকানপাট তৈরির জন্য সুন্দরবনের কোনো গাছ কাটা যাবে না।

 

তিনি জানান, গত শুঁটকি মৌসুমে দুবলার চর থেকে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। এবারও সাড়ে ছয় থেকে সাত কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের আশা করছে বন বিভাগ।

 

সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলোর ভাগ্যের চাকা দীর্ঘদিনেও ঘোরেনি। নানা প্রতিকূলতায় অনেকের আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। ক্রমাগত ক্ষতির মুখে পড়ে কেউ কেউ পুঁজি, জাল ও নৌকা হারিয়ে পেশা ছেড়েছেন। নতুন মৌসুমে মাছ আহরণ ও শুঁটকি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন দেখছেন জেলেরা। তবে ঋণের বোঝা, চড়া সুদ, দস্যুদের আতঙ্ক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়েই তাঁদের এই যাত্রা।

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চট্টগ্রাম বহিঃনোঙ্গরে জাহাজের নিরাপত্তা জোরদারে কোস্ট গার্ডের সমন্বয় সভা

১

রামুতে শিশু অপহরণ ও ধর্ষণ মামলার দুই আসামি গ্রেপ্তার

২

বিরল সীমান্তে ৪২ বিজিবির অভিযান, মালিকবিহীন ১০১ বোতল মদ উদ্ধার

৩

দামুড়হুদায় অবৈধ দুই ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

৪

ঠাকূরগাঁও-১ আসনের উপ-নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিন বিজয়

৫

বগুড়ায় বালুবোঝাই ট্রাকের চাপায় মোটরসাইকেলচালক নিহত, আহত দুই সহকর্মী

৬

বগুড়ার নিশিন্দারা বেওড়াপাড়ায় আইন মেনে বাড়ি নির্মাণের আহ্বান সুলতান মাহমুদের

৭

পীরগঞ্জ সীমান্তে ৪২ বিজিবির অভিযান, উদ্ধার ৫০০ পিস ভারতীয় নেশাজাতীয় ট্যাবলেট

৮

আদর্শ ওয়ার্ড ও মাদক মুক্ত সমাজ গড়তে  চান কাউন্সিলর প্রার্থী মো: ইউসুফ মিয়া

৯

বগুড়ায় শ্যামলী পরিবহনের হেলপারের ব্যাগে ২,৬০০ পিস ইয়াবা, গ্রেপ্তার ১

১০

সোনাতলায় বাংলাদেশ ইসলামিক দাওয়াহ কল্যাণ সোসাইটির মিলন মেলা

১১

মহাজনের চড়া সুদে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন জেলেরা

১২

খুলনায় বাদাবন সংঘের বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত

১৩

আদমদীঘিতে সাংবাদিকদের কটাক্ষ করে ফেসবুকে এসিল্যান্ডের স্ট্যাটাস

১৪

কালীগঞ্জে এসআই ও বিএনপি নেতা নিহতের ঘটনায় ঘাতক পিকআপ উদ্ধার, হেলপার গ্রেপ্তার

১৫

মিঠামইন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গোপন লেনদেনের অভিযোগ, ২৮ সেকেন্ডের ভিডিও ভাইরাল

১৬

সান্তাহারে নতুন কুড়ি স্পোর্টসের খেলোয়াড় বাছাই শুরু

১৭

​শিবগঞ্জ সীমান্তে ৫৯ বিজিবির পৃথক অভিযান ইস্কাফ সিরাপ ও ইয়াবাসহ আটক ২

১৮

সেরা ও স্বাস্থ্যকর স্থান কক্সবাজারে ঢল নেমেছে পর্যটকদের; তবে প্রশ্নের মুখে সার্বিক নিরাপত্তা

১৯

আটোয়ারীতে কৃষকের ১ একর ১৫ শতক জমির করলা নষ্ট, দিশেহারা কৃষক

২০