ডেস্ক রিপোর্ট: আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি খাতে নতুন করে গতি সঞ্চার হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ১৬ কোটি ২৫ লাখ মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। এ আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১১ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের তুলনায় ৩৭ দশমিক ০৯ শতাংশ বেশি।
আলোচিত দুই মাসে পণ্যভিত্তিক রপ্তানি আয়ের চিত্রে দেখা যায়, কাঁচাপাটের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৩৬ শতাংশ, পাটের সুতায় ৫৮ শতাংশ এবং অন্যান্য পাটপণ্যে ৪৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে পাটের বস্তা ও ব্যাগ রপ্তানি থেকে আয় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে।
বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট খাতের মোট রপ্তানি আয় ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮২ কোটি ৮ লাখ ডলারে নেমে যাওয়ার পর এই প্রবৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়।
এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের পাটপণ্য রপ্তানি আয় অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১১৬ কোটি ১৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছিল। ওই সময় চামড়া খাতকে পেছনে ফেলে জাতীয় রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছিল পাট। তবে পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি আয় কমে খাতটি শীর্ষ রপ্তানি পণ্যের তালিকায় তৈরি পোশাক, চামড়া ও হোম টেক্সটাইলের পর চতুর্থ স্থানে নেমে আসে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি মূলত বন্যায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বাজারে কাঁচাপাটের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অর্থমূল্যে ইতিবাচক দেখালেও পণ্যের পরিমাণের দিক থেকে এখনো কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের পণ্যভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ৫৪ কোটি ৫৮ লাখ ডলার আয় নিয়ে পাট রপ্তানির সিংহভাগ দখলে ছিল পাটের সুতা। তবে এর রপ্তানির পরিমাণ ২ শতাংশ কমে ৪ লাখ ২৮ হাজার টনে নেমে আসে।
একই সময়ে পাটের বস্তা ও ব্যাগ রপ্তানি থেকে ১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার আয় হয়। কাঁচাপাট রপ্তানি ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে ১৩ কোটি ১২ লাখ ডলারে নেমে আসে। একই সঙ্গে কাঁচাপাট রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৭৭ শতাংশ কমে মাত্র ৩৮ হাজার টনে দাঁড়ায়। এছাড়া বহুমুখী পাটপণ্যের রপ্তানি আয়ও ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ কমে ৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে তুরস্ক, চীন, ভারত, মিসর, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে প্রচলিত সুতা ও চটের পাশাপাশি পাটের তৈরি বহুমুখী গৃহসজ্জাসামগ্রী, পরিবেশবান্ধব শপিং ব্যাগ, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, বাগান পরিচর্যার সামগ্রী, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ ও প্যাকেজিং পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এছাড়া চীনে পাটকাঠির চারকোলেরও বড় বাজার রয়েছে।
বিশ্বে পাট উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের বার্ষিক ৯০ লাখ বেল কাঁচাপাটের সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে এ খাত থেকে বছরে ৫০০ কোটি ডলার আয় করা সম্ভব বলে বিনিয়োগ বোর্ডের বিভিন্ন সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ক্রয়াদেশ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমে যাওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উদ্যোক্তাদের মুনাফা সংকুচিত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে পাট খাতের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ পাট খাত উন্নয়ন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-৩১)’ শীর্ষক পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রায় ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই মহাপরিকল্পনার আওতায় ২০৩১ সালের মধ্যে বার্ষিক রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করে ১৬৪ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে কাঁচাপাটের জাতীয় উৎপাদন ১১৫ থেকে ১২০ লাখ বেলে উন্নীত করা, স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পাটবীজের চাহিদার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পূরণ এবং মোট রপ্তানিতে উচ্চমূল্যের প্রক্রিয়াজাত ও মূল্য সংযোজিত পাটপণ্যের অংশ ৪৫ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে দেশে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণাগার স্থাপন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করাও এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা হয়েছে।
মন্তব্য করুন