মোঃ নয়ন আলী, পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি : পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ঝলইশালশিরী ইউনিয়নের ধরধরা এলাকায় টাঙ্গন নদীর ওপর প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সেতু ও সংযোগ সড়ক নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চার বছর ধরে চলা নির্মাণকাজ তিন দফা সংশোধনের পর মাত্র দুই থেকে তিন মাস আগে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয় সেতুটি। এরই মধ্যে সামান্য বৃষ্টিতে সেতুর উভয় পাশের সংযোগ সড়কের হেরিংবোন রাস্তা ধসে পড়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকাবাসী।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, ঝলইশালশিরী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ধরধরা এলাকায় টাঙ্গন নদীর ওপর নবনির্মিত সেতুর দুই পাশে প্রায় ২০০ মিটার হেরিংবোন (ইটের) সংযোগ সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। এতে যান চলাচল ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই নানা অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। নদী থেকে নরম বালু তুলে রাস্তা ভরাট করে তার ওপর তড়িঘড়ি করে ইটের হেরিংবোন রাস্তা নির্মাণ করায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ধসে পড়েছে।
এলাকাবাসী জানান, কিছুদিন আগে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করতে গিয়ে স্থানীয় সাংসদ ও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এলাকাবাসীর অভিযোগের মুখে উদ্বোধন না করেই ফিরে যান। এ সময় তিনি নির্মাণকাজের দুরবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পঞ্চগড় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন। ওই ঘটনার ভিডিও ও সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এর আগেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সেতু সংলগ্ন টাঙ্গন নদী থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে রাস্তা ভরাট ও মেরামতের অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য প্রিয়নাথসহ একাধিক বাসিন্দা বলেন, নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলে রাস্তা ভরাট করলে তা আরও শক্ত ও টেকসই হবে—এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এলজিইডির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। তাদের কথায় বিশ্বাস করে এলাকাবাসী তখন কাজের বিরুদ্ধে বাধা দেননি। কিন্তু সেই নরম বালুর ওপর রাস্তা নির্মাণের পর সামান্য বৃষ্টিতেই তা ধসে পড়েছে।
স্থানীয় শিক্ষক মফিজুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চার বছরের বেশি সময় ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা কাজটি মাত্র দুই মাস আগে মানুষের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। অথচ সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। এতে এলজিইডির তদারকির ঘাটতি এবং ঠিকাদারের নিম্নমানের কাজের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।”
এ বিষয়ে বোদা উপজেলা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী আকরাম হোসেন বলেন, “সেতুর দুই পাশের প্রায় ২০০ মিটার হেরিংবোন রাস্তা বৃষ্টিতে ভেঙে পড়েছে। ইতোমধ্যে রাস্তা সংস্কার করে চলাচল স্বাভাবিক করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে রাস্তা এভাবে ধসে পড়বে, তা আমরা ভাবিনি। নিম্নমানের কাজের পেছনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, সেতুর আটোয়ারী অংশের সংযোগ সড়কটি হেরিংবোনের পরিবর্তে স্থায়ীভাবে কার্পেটিং করার জন্য নতুন বরাদ্দের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
পঞ্চগড় এলজিইডির জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি জানার পরপরই যান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এখনো চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়নি। তদন্তে ঠিকাদারের গাফিলতি বা নিম্নমানের কাজের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জনগুরুত্বপূর্ণ এই সেতু ও সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস কর্পোরেশন।
উদ্বোধনের আগেই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক ধসে পড়ায় সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং টেকসইভাবে সংযোগ সড়ক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন