কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চাপাইর ইউনিয়নের বড় গোবিন্দপুর-পাইকপাড়া সংলগ্ন ব্রিজটি দীর্ঘদিনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রায় ৩০ বছরের পুরোনো এই ব্রিজ দিয়ে প্রতিদিন ১০ গ্রামের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ চলাচল করেন। ব্রিজটির বেহাল দশায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ব্রিজটির কার্যকর কোনো সংস্কার করা হয়নি। বর্তমানে ব্রিজের দুই পাশের রেলিংয়ের প্রায় অর্ধেকই ভেঙে গেছে। ভাঙা অংশ পানির দিকে ঝুলে আছে। পাটাতনের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। কোথাও কোথাও ঢালাই খসে পড়েছে। পিলারের পলেস্তারা উঠে গিয়ে রড বের হয়ে পড়েছে এবং সেগুলোতে মরিচা ধরেছে।
ব্রিজের মাঝের অংশও ঢেউয়ের মতো উঁচু-নিচু হয়ে গেছে। সামান্য ভারী যানবাহন উঠলেই পুরো ব্রিজ কেঁপে ওঠে। অতিরিক্ত ঝুঁকির কারণে এক পাশ দিয়ে কোনো ভ্যান উঠলে বিপরীত পাশের যানবাহনকে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
ব্রিজটি এতটাই সরু যে দুটি ভ্যান পাশাপাশি চলাচল করতে পারে না। অথচ প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন এই ব্রিজ ব্যবহার করে। রশিদপুর, গোবিন্দপুর, কোটবাড়ি, কাঞ্চনপুর, পাইকপাড়া, সাতকোড়া, ডুলসমুদ্র, বড়ইবাড়িসহ আশপাশের ১০ গ্রামের মানুষের উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এই ব্রিজ।
বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পানি বাড়লে ব্রিজের নিচ দিয়ে নৌপথে চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ব্রিজটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে এলাকাবাসীকে।
ব্রিজটির দুই পাশে রয়েছে একটি উচ্চবিদ্যালয় ও দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী ঝুঁকিপূর্ণ এই ব্রিজ পার হয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। ব্রিজের ভাঙা রেলিং ও নড়বড়ে পাটাতনের কারণে সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকেরা।
স্থানীয়দের দাবি, গত বর্ষায় এক শিক্ষার্থী ব্রিজ পার হওয়ার সময় পানিতে পড়ে গেলেও সৌভাগ্যক্রমে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এরপরও ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজটির স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক বেড়েছে বহুগুনে।
কৃষিপণ্য পরিবহনেও বাড়ছে দুর্ভোগ। ব্রিজটি শুধু শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নয়, স্থানীয় কৃষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। হাটের দিন কৃষকেরা বিভিন্ন কাঁচামাল ও কৃষিপণ্য ভ্যানসহ ছোট যানবাহনে করে কালিয়াকৈর বাজারে নিয়ে যান।
কিন্তু ব্রিজের উঁচু-নিচু ও ভাঙাচোরা পাটাতনের কারণে প্রায়ই যানবাহনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে প্রতি হাটে কৃষকদের হাজার হাজার টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ব্রিজ ভেঙে পড়লে বিচ্ছিন্ন হতে পারে ১০ গ্রাম তাই স্থানীয়দের আশঙ্কা, ব্রিজটি হঠাৎ ভেঙে পড়লে ১০ গ্রামের মানুষের সঙ্গে উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসসহ কোনো ভারী যানবাহনও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে না। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম দুর্নীতি তালাশ নিউজ টিভিকে বলেন, “ব্রিজটির বয়স প্রায় ৩০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে ঠিকমতো কোনো মেরামত হয় না। বর্ষায় পানি বাড়লে নিচ দিয়েও যাওয়া যায় না, আবার ওপর দিয়েও ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই।”
কালিয়াকৈর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মাকসুদুন্নবী দুর্নীতি তালাশ নিউজ টিভিকে বলেন, “বড় গোবিন্দপুর ব্রিজটি বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এটি একটি টাইম বোমার মতো। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
তিনি জানান, ব্রিজটি সরেজমিন পরিদর্শন করে ইতোমধ্যে প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। নতুন ব্রিজ নির্মাণের জন্য নকশাসহ প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত দরপত্র আহ্বান করে নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।
উপজেলা প্রকৌশলী আরও বলেন, “এই ব্রিজ দিয়ে ১০টি গ্রামের ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ চলাচল করেন। একটি উচ্চবিদ্যালয় ও দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্রিজটি পার হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক। বরাদ্দ না আসা পর্যন্ত এলাকাবাসীকে ভারী যানবাহন ব্রিজটির ওপর দিয়ে না চালানোর অনুরোধ করছি।”
জরুরি বরাদ্দের আশ্বাস এমপির
ব্রিজটির দুরবস্থার বিষয়ে গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান দুর্নীতি তালাশ নিউজ টিভিকে বলেন, “কালিয়াকৈরের মানুষের এই দুর্ভোগের কথা আমি জানি। বড় গোবিন্দপুর ব্রিজটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। আমাদের সন্তান ও কৃষকেরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্রিজটি পার হচ্ছেন। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
তিনি বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে সড়ক ও জনপথ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ব্রিজটির জন্য জরুরি বরাদ্দের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেবেন। প্রকল্প প্রস্তাব যেহেতু ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে, তাই দ্রুত অনুমোদন নিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রয়োজনে নিজে সরেজমিনে ব্রিজটি পরিদর্শনের কথা জানিয়ে সংসদ সদস্য বলেন, “কালিয়াকৈরের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা আমার প্রথম অগ্রাধিকার। আর একদিনও মানুষকে এই ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ দিয়ে চলতে দেওয়া উচিত নয়।”
এলাকাবাসীর তিন দফা দাবি
ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজটি দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের দাবিতে এলাকাবাসী তিন দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলো হলো—
১. অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজটিতে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে বিকল্প হিসেবে একটি বেইলি ব্রিজ স্থাপন।
২. দ্রুত নতুন ব্রিজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করা।
৩. বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আগেই প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা।
রেলিংয়ের বড় অংশ ভাঙা, পাটাতনে ফাটল, পিলারে রড বেরিয়ে পড়া—সব মিলিয়ে ব্রিজটির ঝুঁকি এখন স্পষ্ট। প্রতিদিন শিশু, শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে এই ব্রিজ ব্যবহার করছেন। উপজেলা প্রকৌশলী যেখানে ব্রিজটিকে ‘টাইম বোমার মতো’ বলে সতর্ক করেছেন, সেখানে সংসদ সদস্যও দিয়েছেন জরুরি বরাদ্দের আশ্বাস।
এখন এলাকাবাসীর একটাই প্রশ্ন—বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কি ব্রিজটির জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ মিলবে, নাকি একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পরই নড়েচড়ে বসবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ?
মন্তব্য করুন