বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ২ কোটি মার্কিন ডলার বিক্রি করেছে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা দরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে এসব ডলার সরবরাহ করা হয়। বাজারে ডলারের বিনিময় হার ১২৪ টাকার নিচে ধরে রাখাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার এ লেনদেন সম্পন্ন হয়। এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৮০ পয়সা দরে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরে দ্বিতীয়বারের মতো রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করা হলো। একই সঙ্গে আগের বিক্রয়মূল্যের তুলনায় এবার প্রতি ডলারের দাম ৮৫ পয়সা বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো ব্যাংকের কাছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকার বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করছিল। এ দরে লেনদেন শুরু হলে বাজারে ডলারের বিনিময় হার দ্রুত ১২৪ টাকা অতিক্রম করতে পারত। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি ডলার সরবরাহের মাধ্যমে বাজারে হস্তক্ষেপ করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত এক সপ্তাহ ধরে ডলারের বিনিময় হার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ পয়সা করে বাড়ছিল। গত রোববার আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ডলারের দর ছিল ১২৩ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৮০ পয়সার মধ্যে।
সরকারি ছুটির আগে বাড়ছে ডলারের চাহিদা
টানা পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি সামনে রেখে ব্যাংকগুলোও বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ছুটির সময়ে আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রয়োজন মেটাতে নিজেদের নস্ট্রো অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত ডলার রাখতে চাইছে তারা। ছুটি শেষে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বৈদেশিক মুদ্রায় বিভিন্ন পরিশোধের দায় থাকায় আগেভাগেই ডলারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো উল্লেখযোগ্য। এমন অবস্থায় ডলারের দাম বাড়লে আমদানি পণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বাজারদর ও মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। এ কারণে ডলারের বিনিময় হার ১২৪ টাকার ওপরে ওঠা ঠেকাতে আপাতত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রয়োজন অনুযায়ী রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ অব্যাহত রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
আমদানি ব্যয় ও বাণিজ্য ঘাটতিতে চাপ
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও সারের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে পড়ছে। জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বাড়ায় গত সেপ্টেম্বরে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ঋণপত্র খোলা হয়েছে। গত ৫৩ মাসের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে পণ্য আমদানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এ দুই মাসে আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলারে। একই সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে ৩৮২ কোটি ডলার।
তবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবাহ রয়েছে। চলতি অক্টোবরের প্রথম ১৭ দিনে দেশে এসেছে ১৭৪ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স। আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক পরিশোধের চাপ এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহ—সব মিলিয়ে ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন